আলুর বাজারে সরকারের নির্দেশনা উপেক্ষিত

Lifestyle Tech

ভোক্তা, আড়ত ও কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে আলুর সর্বোচ্চ দাম বেঁধে দিয়েছে সরকার। তবে সরকারের এই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না কোনো পর্যায়েই।আলুর অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ অক্টোবর ভোক্তা, আড়ত ও কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে আলুর সর্বোচ্চ দাম বেঁধে দিয়ে কৃষি বিপণন অধিদফতর থেকে ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কাছে চিঠি পাঠানো হয়। এক সপ্তাহ পর গতকাল বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিষয়টি জানাজানি হয়।

কৃষি বিপণন অধিদফর থেকে জেলা প্রশাসকদের ভোক্তা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত করতে করতে বলা হয়। সেই সঙ্গে, কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ের সর্বোচ্চ ২৩ টাকা এবং আড়তে ২৫ টাকা কেজি আলু বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়।

গতকাল কৃষি বিপণন অধিদফতর থেকে আলুর দাম বেঁধে দেয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে দিনজুড়েই সর্বোত্রই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে আলু। কমে দামে আলু পাওয়ার আশায় আজ বৃহস্পতিবার সকালে অনেক ক্রেতাই বাজারে ছুটে যান। তবে বাজারে গিয়ে তাদের হতাশ হতে হয়েছে। কারণ আগের মতোই আলুর জন্য চড়া দাম গুনতে হয়েছে।

রামপুরা বাজারে আলু কিনতে আসা আশরাফুল ইসলাম হতাশার সুরে বলেন, ‘গতকাল গণমাধ্যমে দেখলাম সরকার আলুর দাম খুচরা পর্যায়ে ৩০ টাকা বেঁধে দিয়েছে। কম দামে আলু কিনতে পারব-এই আশায় বাজারে এসেছি। কিন্তু সবাই গতকালের মতো প্রতি কেজি আলুর দাম ৫০ টাকা চায়। বাজারে সরকারের বেঁধে দেয়া দামের তো কোনো বাস্তবায়ন দেখছি না।’

আলুর দাম নিয়ে একই ধরনের হতাশা ব্যক্ত করেন কারওয়ান বাজারে বাজার করতে আসা মইনুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘শুধু দাম বেঁধে দিলে হবে না, সংশ্লিষ্টদের দ্রুত মাঠে নামতে হবে। কঠোর মনিটরিং করতে হবে। তা নাহলে কেউ সরকারের কথা শুনবে না।’মইনুল হোসেন বলেন, ‘গতকাল সব মিডিয়াতেই দেখলাম, আলুর দাম খুচরা পর্যায়ে ৩০ টাকা বেঁধে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কারওয়ান বাজারেই আলুর কেজি ৪৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। সুতরাং অন্য বাজারের কী অবস্থা তা সহজেই অনুমান করা যায়।’

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আলুর খুচরা, পাইকারি ও কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতিকেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪২ টাকা কেজি। আর কোল্ডস্টোরেজে আলুর কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা।

অবশ্য কোল্ডস্টোরেজ থেকে জানানো হচ্ছে, দুদিন ধরে আলু বিক্রি একপ্রকার বন্ধ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে মুন্সিগঞ্জের একতা কোল্ডস্টোরেজের মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আলুর দাম বেঁধে দেয়ার কারণে গতকাল থেকে আমাদের বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা আলুর ক্রেতা পাচ্ছি না। সর্বশেষ ৪০ টাকা কেজি আলু বিক্রি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার থেকে আলুর দাম বেঁধে দেয়ার সময় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। কিন্তু এটা করা হয়নি।’তিনি আরও বলেন, ‘আলুর এখন যে দাম সেটা অবশ্যই অস্বাভাবিক। তবে সরকারের বেঁধে দেয়া দামও যৌক্তিক না। আমাদের মতো খুচরা পর্যায়ে আলুর কেজি ৪০ টাকা এবং পাইকারিতে ৩৫ টাকা করা যৌক্তিক হবে। আর কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে ৩২-৩৩ টাকা করা যেতে পারে।’

আলুর অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণ হিসেবে মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ডিসেম্বরে যে আগাম আলু হয়, এবার সেই আলুর চাষ হয়নি। ফলে নতুন আলু ডিসেম্বরের বদলে এবার জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে আসবে। আলুর মৌসুম এই দুই মাস পিছিয়ে যাওয়া দাম বাড়ার অন্যতম কারণ। এছাড়া মহামারি করোনার কারণে এবার ত্রাণ হিসেবে অনেক আলু বিতরণ করা হয়েছে। আবার বাজারেও আলুর পর্যন্ত চাহিদা রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে আলুর এমন অস্বাভাবিক দাম হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন আলুর ব্যবসায়ীরা একটু লাভ করছে ঠিক আছে। কিন্তু গত দুই বছর আলুর ব্যবসায়ীরা যে লোকসান করেছে তা কেউ বলে না। তাছাড়া এখন বেশিরভাগ সবজির কেজি একশ টাকার কাছাকাছি। কিন্তু তা নিয়ে কেউ কিছু বলে না। সবাই আলু নিয়ে পড়ে আছে। এমন হলে সামনে আলুর চাষ হবে না।’আলুর খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আড়তে পর্যাপ্ত আলু রয়েছে। তবে কোনো আড়তেই ৪০ টাকার নিচে আলু পাওয়া যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে মালিবাগ হাজীপাড়া বৌ-বাজারের ব্যবসায়ী মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আড়তে আলুর অভাব নেই। কিন্তু ৪০ টাকা কেজির নিতে আড়তে আলু পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য গতকালের তুলনায় আজ আড়তে কেজিতে দুই টাকা কমে আলু পেয়েছি। গতকাল ৪২ টাকা কেজি কেনা পড়েছিল।’তিনি বলেন, ‘আড়ত থেকে কম দামে আলু আনতে পারলে আমরাও কম দামে বিক্রি করতে পারব। তবে আড়ত থেকে বলা হচ্ছে, তাদের কাছে যে আলু রয়েছে, সেই আলু আগের কেনা। এখন নতুন করে তারা আলু কিনছে না।’মধ্য বাড্ডার ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘গতকাল আড়ত থেকে যে দামে আলু কিনেছি, আজও একই দাম আলু কিনতে হয়েছে। সব খরচ মিলিয়ে আমাদের পক্ষে আলুর কেজি ৫০ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।’

এদিকে কৃষি বিপণন অধিদফতর থেকে ডিসিদের দেয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত আলুর মৌসুমে প্রায় এক কোটি ৯ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। দেশে মোট আলুর চাহিদা প্রায় ৭৭ লাখ ৯ হাজার টন। এতে দেখা যায় যে, গত বছর উৎপাদিত আলু থেকে প্রায় ৩১ লাখ ৯১ হাজার টন আলু উদ্বৃত্ত থাকে। কিছু পরিমাণ আলু রফতানি হলেও ঘাটতির সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

এতে আরও বলা হয়েছে, আলুর মৌসুমে যখন হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে তখন প্রতি কেজি আলুর মূল্য ছিল সর্বোচ্চ ১৪ টাকা। প্রতি কেজি আলুতে হিমাগার ভাড়া বাবদ তিন টাকা ৬৬ পয়সা, বাছাই খরচ ৪৬ পয়সা, ওয়েট লস ৮৮ পয়সা, মূলধনের সুদ ও অন্যান্য খরচ বাবদ ২ টাকা ব্যয় হয়। অর্থাৎ এক কেজি আলুর কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ের সর্বোচ্চ ২১ টাকা খরচ পড়ে।

চিঠিতে বলা হয়, সংরক্ষিত আলুর কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে বিক্রয় মূল্যের ওপর সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশ লভ্যাংশ, পাইকারি পর্যায়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ যোগ করে ভোক্তার কাছে আলু বিক্রি করা যুক্তিযুক্ত। এক্ষেত্রে হিমাগার পর্যায় থেকে প্রতি কেজি আলু ২৩ টাকা মূল্যে বিক্রি করলে আলু সংরক্ষণকারীর দুই টাকা মুনাফা হয় বলে প্রতীয়মান হয়। অন্যদিকে আড়তদারি, খাজনা ও লেবার খরচ বাবদ ৭৬ পয়সা খরচ হয়। সেই অনুযায়ী পাইকারি মূল্য (আড়ত পর্যায়) ২৩ টাকা ৭৭ পয়সার সঙ্গে মুনাফা যোগ করে সর্বোচ্চ ২৫ টাকা করা যেতে পারে।

এতে আরও বলা হয়েছে, একজন চাষির প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ হয়েছে ৮ টাকা ৩২ পয়সা। এমতাবস্থায় হিমাগার পর্যায় থেকে প্রতি কেজি আলুর মূল্য ২৩ টাকা, পাইকারি/আড়তের মূল্য ২৫ টাকা এবং ভোক্তা পর্যায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩০ টাকা হওয়া বাঞ্ছনীয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *