করোনায় কাজ হারিয়ে কাতার ছেড়েছেন ৭,৭৬৯ শ্রমিক

আন্তর্জাতিক

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রভাবে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে গত পাঁচ মাসে ২৬টি দেশ থেকে অন্তত ৯৫ হাজার ৬২ জন বাংলাদেশি শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। তাদের মধ্যে ৮৮ হাজার ৪০৬ জন পুরুষ এবং ৬ হাজার ৬৬৫ জন নারী শ্রমিক।অভিবাসী শ্রমিকদের দেখভালকারী প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গত ১ এপ্রিল থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা যায়।

তবে চলতি বছরের এপ্রিলের আগে অর্থাৎ আগের তিন মাসে যারা ছুটিতে দেশে এসে আটকা পড়েছেন এবং যারা পাসপোর্ট-ভিসা ঠিক হওয়ার পরও যেতে পারেননি, তাদের ধরলে এই সংখ্যা পৌনে ৩ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান।প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, গত চার মাসে সবচেয়ে বেশি কর্মী ফিরে এসেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। সেখানকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ না থাকার কথা বলে ২৯ হাজার ৭১৪ জন বাংলাদেশিকে ছুটিতে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তাদের নারী শ্রমিক রয়েছেন ১ হাজার ৪৮৫ জন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ না থাকায় এসব শ্রমিককে দেশে পাঠানো হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার তাদের দেশটিতে নেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে।আমিরাতের পর সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক ফেরত পাঠায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব। দেশটিতে অবৈধ হয়ে পড়ার পর বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করে আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরেছেন ২০ হাজার ৮২৯ জন, যাদের মধ্যে নারী ২ হাজার ৩৪৫ জন।

পর্যটননির্ভর দেশ মালদ্বীপে মহামারির মধ্যে কর্মহীন হয়ে পড়েন বিদেশি কর্মীদের অনেকেই। সেখান থেকে ৪০ জন নারীসহ ৮ হাজার ৪৯৭ জন বাংলাদেশি কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।কুয়েত থেকে ৯১ জন নারীসহ দেশে ফিরেছেন ৭ হাজার ৯৪১ জন। দেশটি আকামা বা ভিসার মেয়াদ না থাকায় বা অবৈধ হওয়ায় সাধারণ ক্ষমার আওতায় এসব বাংলাদেশি শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠায়। এদের মধ্যে আবার অনেক শ্রমিক বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করে দেশে ফেরেন।

কাজ না থাকায় কাতার থেকে ৭ হাজার ৭৬৯ জন শ্রমিককে দেশে ফেরত আসতে হয়। তাদের নারী শ্রমিক রয়েছেন ৫০৬ জন।আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত রাষ্ট্র ওমান থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে ৫ হাজার ৭১৩ জনকে। তাদের মধ্যে ৩৮৮ জন নারী শ্রমিক। এসব শ্রমিক বিভিন্ন দেয়াদে কারাভোগ করে আউটপাস নিয়ে দেশে আসেন।কাজ না থাকায় মালয়েশিয়া থেকে ফিরতে হয়েছে ৯৫ জন নারীসহ ২ হাজার ৯৭৯ জন শ্রমিককে।

কাজের চুক্তি শেষ হওয়ার পর মেয়াদ না বাড়িয়ে সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত পাঠানো হয় ১ হাজার ৬০৪ জনকে। তাদের মধ্যে ৪ জন নারী শ্রমিক।বাহরাইন থেকে দেশে ফিরেছেন ৭৪৬ জন। সেখানে বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করে আউটপাস নিয়ে দেশে আসেন। এছাড়া অসুস্থ ও চাকরি হারিয়ে এদের অনেকে ফেরত আসেন।কাজ না থাকায় দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৭১ জন, কম্বোডিয়া থেকে ৪০ জন, মিয়ানমার থেকে ৩৯ জন এবং থাইল্যান্ড থেকে ২০ জন দেশে ফিরে আসেন।চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় জর্ডান থেকে ১ হাজার ৭৬ জন; পুরুষ ২৬০ জন এবং নারী ৮১৬ জন এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০০ জন দেশে ফিরে আসেন।

ইরাক থেকে ২ হাজার ৭১৬ জন; শ্রীলংকা থেকে ১৩৫ জন, ভিয়েতনাম থেকে ১২২ জন এবং মরিশাস থেকে ৩৬ জন দেশে ফেরেন ফেরেন করোনা পরিস্থিতিতে কাজ হারিয়ে।রাশিয়া থেকে ১০০ জন, তুরস্ক থেকে নারী ২৫৪ জনসহ ২ হাজার ৮০৩; লেবানন থেকে ৫৮৮ জন নারীসহ ১ হাজার ৭৮২ জন; নেপাল থেকে ১৫ নারীসহ ৫৫ জন, হংকং থেকে চার নারীসহ ১৬ জন দেশে ফেরত এসেছেন। তাদের দেশে ফেরার কোনো কারণ জানায়নি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়।দেশে ফেরত আসা বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে গত ৬ জুলাই ইতালি থেকে করোনা সন্দেহে দেশে ফেরত পাঠানো ১৫১ জনও তালিকায় রয়েছে। এছাড়া আইএম জাপান চুক্তির মাধ্যমে তিন বছরের মেয়াদ শেষে জাপান থেকে ছুটিতে দেশে এসেছেন আটজন কর্মী।সরকারের এই পরিসংখ্যান একরকম সঠিকই বলে মনে করেন ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কিন্তু এর বাইরে এপ্রিলের আগের তিন মাসের হিসাবটা এখানে নেই। তখন দেশে আসা অনেকেই কিন্তু আটকা পড়েছে। করোনার কারণে আসেনি এমন প্রবাসীর সংখ্যাও প্রায় লাখ খানেক হবে। যদি সব দিক হিসাব করে দেখা হয়, তবে এই সংখ্যাটা ৯৫ হাজার কম বলা হবে। যোগফল মিলিয়ে কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত ইতিমধ্যে পাঁচ লাখ হয়ে গেল।’

পাঁচ লাখ ক্ষতিগ্রস্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শরিফুল হাসান বলেন, ‘প্রতি মাসে ৬০ হাজার লোক বিদেশ যেত। এ হিসাবে গত পাঁচ মাসে ৩ লাখ বিদেশ যেতে পারেনি। এদের মধ্যে এক লাখের পাসপোর্ট-ভিসা তৈরি করা ছিল। ছুটিতে এসে আটকা পড়েছে এ রকম লোকের সংখ্যা কত সেটা আমরা জানি না। তবে এটা এক লাখের বেশি হয়ে যেতে পারে।’সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৬০টি দেশে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান ও লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এবং মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে স্বল্প বেতনের শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন দেশ অর্থনৈতিক চাপে পড়ায় হাজার হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী চাকরি হারিয়েছেন। তাদের জন্য ১১ কোটি টাকার তাৎক্ষণিক খাদ্য ও চিকিতসা সহায়তা বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে বিতরণ করেছে সরকার।প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় দেশে ফিরে আসা এবং বিদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে মারা যাওয়া শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দিতে ২০০ কোটি টাকার তহবিল তৈরি করেছে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক গত মাসে এই ঋণ বিতরণ শুরু করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *