‘কিশোরগঞ্জের হাওর পর্যটনে আসা পর্যটকরা টাকার মেশিন!’

জাতীয়

করোনাকালেও দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বৃহত্তর হাওরাঞ্চলের ‘গেটওয়ে’ হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জের হাওর পর্যটন এলাকা ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে।আর এ কারণে এখানকার নিকলী বেড়িবাঁধ হাওর পর্যটন এবং ইটনা- মিঠামইন- অষ্টগ্রাম উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত পানির বুক চিড়ে বয়ে চলা ‘অলওয়েদার সড়কপথ’ পর্যটন এলাকায় প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের ঢল নামছে। আসছেন অনেক বিদেশি পর্যটকও।

কিন্তু কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় খেয়াল খুশি মতো মাত্রাতিরিক্ত নৌকা, স্পিডবোট, অটোরিকশা ও মোটরবাইক ভাড়া এবং হোটেলে খাবার মূল্য আদায় করায় পর্যটকদের মধ্যে চরম বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। উপরন্তু গাড়ি পার্কিং, মোটেল এবং প্রয়োজনীয় শৌচাগার না থাকায় পরিবার নিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে পর্যটকদের।জল ও সড়কযানের এমন পকেটকাটা ভাড়া এবং খাদ্যসামগ্রীর মূল্য আদায় এই সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

এ হাওর পর্যটনে নিয়মিত আসা ভুক্তভোগী দ্য ব্যাকপ্যাকার্স নামে একটি ভ্রমণপিপাসু গ্রুপের হোস্ট ফয়সাল আহমেদ এর সঙ্গে কথা হলে তিনি অভিযোগ করেন, ‘হাওরের জিনিসপত্রের এমন দাম সারা দেশের অন্য অঞ্চলকে ছাড়িয়ে গেছে। আর ওখানকার মানুষজনেরা তো পর্যটকদের এক একজনকে টাকার মেশিন মনে করছেন। নিকলী থেকে মিঠামইন নৌকা ভাড়া প্রকার ভেদে ৭ হাজার থেকে ১৮ হাজার পর্যন্ত। তাও আবার সন্ধ্যার আগে ফিরে আসতে হবে।

সন্ধ্যার পরে ফিরলে আলাদা একস্ট্রা টাকা! একদিনের জন্য এতো বেশি বোট ভাড়া দেশের আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই। আমার তো মনে হচ্ছে, আমাদের দেশের পর্যটন শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী।’অপরদিকে, ঢাকা থেকে ২৫ জনের গ্রুপ নিয়ে এ হাওর পর্যটন এলাকায় ঘুরতে আসা গণমাধ্যম কর্মী দলের ভ্রমণপিপাসু পর্যটক সাঈদ আল হাসান শিমুলও ক্ষোভ ঝাড়লেন মাত্রাতিরিক্ত নৌকা ভাড়া আদায় নিয়ে।এ ভুক্তভোগী জানালেন, তারা ২৫ জন নিকলী বেড়িবাঁধ পর্যটন এলাকা ঘুরে এখান থেকে দুপুর দেড়টার দিকে একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে মিটামইনের দৃষ্টিনন্দন অলওয়েদার সড়কপথে যান।

সেখানে সেই সড়কপথ পর্যটনেও অটোরিকশা অতিরিক্ত ভাড়া নেয় এবং সেখান থেকে এক-ই ট্রলারে রাত ৯ টার দিকে নিকলী ফিরে আসার পর ৬ হাজার টাকা ভাড়া গুণতে হয়।এ ভাড়া বড়জোর সাড় তিন হাজার টাকা হতে পারত। এছাড়াও তার অভিযোগ এমন সম্ভবনাময় পর্যটন এলাকায় বসবাসযোগ্য আবাসিক হোটেল নেই, নেই পর্যটন এলাকায় উপযুক্ত শৌচাগারের ব্যবস্থা।এসবই কারণ এই পর্যটন এলাকায় আসতে পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করার জন্য যথেষ্ট মনে করেন তিনি।

উল্লেখ্য, কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা নিকলী উপজেলা সদরকে রক্ষায় ২০০০ সালে সরকার পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং পার্শ্ববর্তী ছাতির চর গ্রাম ভাঙনের কবল থেকে রক্ষায় অসংখ্য পানি সহিষ্ণু করচ গাছ বন তৈরি করে।বর্ষায় এই এলাকা কানায় কানায় ডুবে গিয়ে সাগরের ন্যায় দিগন্ত বিস্তৃত এক ভিন্ন রকম নৈসর্গিক সৌন্দর্যে রূপ নেয়।বেড়িবাঁধে আছড়ে পড়া উত্তাল ঢেউয়ের দৃশ্য, নৌকা ও স্পীড বোটে ঘুরে বেড়ানো, আর করচবনের শীতল ছায়ায় জলকেলি পর্যটকদের হৃদয় মন আন্দোলিত করে।

একই সঙ্গে পার্শ্ববর্তী হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম পর্যন্ত হাওরের বুক চিড়ে বিস্তৃত ২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য দৃষ্টি নন্দন অলওয়েদার সড়কপথ বর্ষায় পর্যটকদের কাছে ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। চারদিকে সাগরের ন্যায় থৈথৈ পানি আর মাঝপথে সরীসৃপের ন্যায় এঁকেবেকে চলা এ সড়কপথ পর্যটনও মুখরিত হয়ে ওঠে পর্যটকদের কোলাহলে।এ ব্যাপারে কথা হলে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুদ্দিন মুন্না যুগান্তরের কাছে ট্রলার, নৌকায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ হোটেলে খাদ্য মূল্য অধিক রাখার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

তিনি জানান, তিনি ইতিপূর্বে উপজেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটির মাধ্যমে নৌযানগুলোর ভাড়া এবং খাদ্য সামগ্রী মূল্য নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্টদের ডেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি ওই কমিটির মাধ্যমে উপযুক্ত নৌযান ভাড়া ও খাদ্য সামগ্রীর মূল্য নির্ধারণ করে চার্ট টাঙিয়ে দেয়ার আশ্বাস দেন।একই সময় তিনি নিকলী পর্যটন এলাকায় আরও কয়েকটি শৌচাগার নির্মাণ এবং গাড়ি পার্কিংয়ের উপযুক্ত স্থান নির্ধারণের পদক্ষেপের কথা জানালেন।

এ সময় তিনি আরও জানান, সোমবার নিকলী সদর ইউনিয়ন পরিষদ এমন পরিস্থিতিতে নৌযান ভাড়া নির্ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট দিয়েছে। যেখানে প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য তার মোবাইল নাম্বারও সংযুক্ত করা হয়েছে।প্রকৃতপক্ষে নির্ধারিত এ ভাড়ার সঙ্গে তিনি মোটেও একমত নন। ভাড়া আরও বাস্তবসম্মত করা জরুরি। ওই নির্ধারিত ভাড়া নিয়েও ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

অপরদিকে, জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরীর সঙ্গে কথা হলে তিনি যুগান্তরকে জানান, গোটা কিশোরগঞ্জ জেলাকে পর্যটন বলয়ের মধ্যে আনতে কাজ করছে সরকার। তবে বর্তমান ব্যবস্থায় নৌযানগুলোতে যাত্রীদের জীবন রক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ইতিমধ্যেই কয়েকটি দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজন পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। তাই এমন পরিস্থিতিতে লাইফ জ্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নৌযান মালিক ও ব্যবসায়ীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *