চিরচেনা বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে নওশেরের মলিন বিদায়

Music Tech খেলাধূলা

এই বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম ছিল তার নিজ আলয়। হাজারও দিন তিনি এসেছেন দেশের ক্রীড়াকেন্দ্রে; খেলেছেন, মাঠ মাতিয়েছেন, দর্শকদের আনন্দ দিয়েছেন। গোল করে নিজ দল জিতিয়ে বিজয়ীর বেশে মাঠ ছেড়েছেন, পেয়েছেন সমর্থকদের অকুণ্ঠ প্রশংসা।

এই স্টেডিয়ামই তাকে দিয়েছে দেশজোড়া খ্যাতি ও সুনাম। চাঁদপুরের ছেলে, মুন্সিগঞ্জে বড় হওয়া মোহামেডানের স্ট্রাইকার কে এম নওশেরুজ্জামান হয়ে উঠেছেন দেশের অন্যতম সেরা ও সফল স্ট্রাইকার। ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোয় লাল সবুজ পতাকা হাতে দেশ মাতৃকার স্বাধিকার আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন নওশের। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অন্যতম সদস্যও তিনি।

আজ (মঙ্গলবার) সকালে আবার সেই দেশের ক্রীড়াকেন্দ্র বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে এলেন নওশের, লাশ হয়ে। যে মাঠ ছিল তার সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু, গোলের পর গোল করে যে মাঠকে স্মরণীয় করে রেখেছেন, প্রিয় দল মোহামেডানকে জয় উপহার দিয়ে সবার মধ্যমনি হয়ে থেকেছেন- আজ সেই বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে লাশবাহী হিমশীতল গাড়িতে প্রাণস্পন্দনহীন নিথর দেহ নওশেরের।

যে মাঠে শতবার বিজয় উল্লাসে মেতেছেন, তাকে নিয়ে বিজয় উৎসব হয়েছে, সেই মাঠে শেষবারের মত ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন রনাঙ্গনের বীর মুুক্তিযোদ্ধা, দেশবরেণ্য স্ট্রাইকার নওশেরুজ্জামান। তার জানাযা অনুষ্ঠিত হলো মঙ্গলবার সকালে।

খেলোয়াড়ি জীবনে ডি বক্সে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের মাথা ব্যথার কারণ ছিলেন নওশের। বিপক্ষ শিবিরের ত্রাস, গোল করায় দারুণ পারদর্শী চাঁদপুরের এ সদা হাস্যোজ্জ্বল, রসিক ও প্রাণখোলা নওশের চায়ের আড্ডায়ও ছিলেন দারুণ উচ্ছল। মানুষ হিসেবে ছিলেন সরল, সাদাসিধে।

করোনা কেড়ে নিল তার প্রাণ। অসম্ভব প্রাণশক্তির অধিকারী, শারীরিকভাবে প্রচণ্ড শক্ত-সামর্থ ৭২ বছরের প্রাণবন্ত মানুষটিও শেষ পর্যন্ত করোনার কাছে হেরেই চলে গেছেন ওপারে।

তার সমসাময়িক, বন্ধু ও অনুজপ্রতিম ফুটবলার-ক্রিকেটারদের অনেকেই দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী ও বিশ্ববিদ্যালয় ‘ব্লু’ নওশেরুজ্জামান বরাবরই খানিক উপেক্ষিত ছিলেন। ফুটবলের পাশাপাশি এক যুগের বেশি সময় ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটেও নিয়মিত অংশ নিয়েছেন। ঢাকা মোহামেডান ছাড়া কলাবাগানের হয়েও খেলেছেন।

নওশেরের অপর দুই ভাই শরীফ ও আরিফ সত্তর দশকে ঢাকা মোহামেডানের হয়ে খেলেছেন। এর মধ্যে স্ট্রাইকার নওশের ও সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার শরীফ সত্তরের মাঝামাঝি শেষপর্যন্ত মোহামেডানের হয়ে প্রায় নিয়মিতই খেলেছেন। এছাড়া তাদের অপর তিন ভাইও রহমতগঞ্জ, দিলকুশা ও বিআরটিসির হয়ে ঢাকার ফুটবলে খেলেছেন।

কিন্তু খেলোয়াড়ি জীবন শেষে নিজ ক্লাব কিংবা ফেডারেশন, ক্রিকেট বোর্ডের কোন উচ্চ পদে আসীন হননি বা হওয়া হয়ে ওঠেনি। আসলে নিজেকে আর সেভাবে জড়াতেও চাননি নওশের। তিনি যে খেলোয়াড়ি জীবন শেষে ক্রীড়াঙ্গনের কোথাও কোন বড় পদে নেই, কখনও ছিলেন না- তা নিয়ে তেমন কোন আফসোসও ছিল না তার।

তবে বিদায় বেলা হয়তো আরও অনেক কিছু প্রাপ্য ছিল তার। ফুটবলার, ক্রিকেটার নওশের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল এবং প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় দলের সদস্য হিসেবে নওশেরের শেষ বিদায়টা হলো বড়ই সাদামাটা। একটা দায়সাড়া গোছের আয়োজন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। সাকুল্যে শ’খানেক মানুষ উপস্থিত জানাযায়। যার অর্ধেক তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজন। ক্রীড়াঙ্গনের চেনামুখ বলতে শুধু দেখা মিলল সাবেক জাতীয় ফুটবলার আব্দুল গাফফার, সফিকুল ইসলাম মানিক, ইকবাল, শাহনাওয়াজ খান শুভ্র আর স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রতিনিধি সাত্তারের।

যাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেই রক্তস্নাত দিনে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জার্সি গায়ে ভারতের এ মাথা থেকে ও মাথা চষে বেরিয়েছেন, জনমত ও সমর্থন আদায়ে প্রাণপন চেষ্টা করেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তহবিল সংগ্রহে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন; সেই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সঙ্গী জাকারিয়া পিন্টু, প্রতাপ শংকর হাজরা, কাজী সালাউদ্দীন, সাইদুর রহমান প্যাটেলের কেউ আসেননি তাকে শেষ বিদায় জানাতে।

ফুটবলার নওশের দক্ষ ক্রিকেটারও ছিলেন। সত্তর দশকের প্রায় সব নামী, প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটারই হয়তো তার বন্ধু, সমবয়সী না হয় অনুজপ্রতিম। পারিবারিক সূত্রে জানা ক্রিকেটার বন্ধু তানভির মাজহার তান্না খোঁজখবর নিয়েছেন প্রায় নিয়মিত। কিন্তু ক্রিকেটাঙ্গনের একজন পরিচিত মুখেরও দেখা মেলেনি নওশেরের জানাযায়। ফুটবলারদের প্রাণের সংগঠন ‘সোনালী অতীত’ এরও কেউ আসেননি প্রিয় ‘নওশের ভাই’কে শেষ বিদায় জানাতে।

ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ আর দুই নির্বাহী সদস্য ইকবাল ও শাহনাওয়াজ শুভ্র এসেছিলেন। তার বিদায় বেলা এমন এক সাদামাটা আয়োজন ও অল্প সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখেও এতটুকু হতাশ নয় নওশেরুজ্জামানের পরিবার।

বড় ভাই বদিউজ্জামানের কণ্ঠে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। বার বার বললেন, ‘নওশেরের পরিবারের সবাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আমার ভাই নওশের অসুস্থ হবার পর তিনি খোঁজখবর নিয়েছেন। তার চিকিৎসার সমুদয় খরচ বহন করেছেন। আমাদের একটি পয়সাও খরচ করতে দেননি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ আন্তরিকতার কথা আমরা আজীবন মনে রাখব।’

এছাড়া সরকারের উচ্চপর্যায়ে ছুটোছুটি করে যিনি এই করোনার মধ্যে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জানাযা আয়োজন করেছেন, সেই সাবেক ফুটবলার গাফফারও প্রয়াত নওশেরের আত্মার শান্তি কামনা করেন। তার সঙ্গে খেলার স্মৃতিচারণও করেছেন।

সকাল ঠিক ১০টা ৫ মিনিটে জানাজার অল্পসময় পর নওশেরের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মুন্সিগঞ্জে। পিতার চাকরির সুবাদে সেখানে বড় হয়েছেন নওশের। তবে তার সর্বশেষ ঠিকানা হবে চাঁদপুরের মতলবে নিজ গ্রামের বাড়িতে। বাদ আসর তৃতীয় ও শেষ জানাজার পর তাকে দেয়া হবে সম্মানসূচক গার্ড অব অনার। তারপর সেখানেই চির নিদ্রায় শায়িত হবেন দেশের ফুটবলের সোনালী সময়ের অন্যতম নায়ক, স্বাধীনতার পর ঢাকা মোহামেডানের প্রথম লিগ শিরোপা বিজয়ের অন্যতম রুপকার (সেবার ২১ গোল করে তিনিই ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা) নওশের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *