জীবন ভর তাবলিগের মেহনত চলুক

যখনই জাহান্নামে কোনো দলকে নিক্ষেপ করা হবে, তাদেরকে রক্ষীরা বলবে- তোমাদের কাছে কি রাসূল কিংবা সতর্ককারী আসেনি? যারা তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের আয়াত আবৃত্তি করত এবং এ দিনের সাক্ষাৎ সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করত। তারা বলবে- অবশ্যই এসেছিল। (৬৭:৮, ৩৯:৭১)।এ আয়াত দুনিয়াতে বান্দাকে তার দায়িত্বের কথা, পরিশুদ্ধ জীবনব্যবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ফলে দ্বীন প্রচারে প্রত্যেককেই সর্বস্ব ত্যাগে প্রস্তুত হয়ে উঠতে হয়। যারা এ দায়িত্ব পালনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন- এদেরই ‘তাবলিগ জামাত’ বলে জানি।কোরআনে আল্লাহর বাণী প্রচার করা/পৌঁছান অর্থে মূল শব্দ তাবলিগ (বাল্লিগ) উল্লেখ আছে ৬ বার, বালাগ ১৫ বার। বলা হয়েছে- হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার কর (বাল্লিগ)। যদি না কর তবে তো তুমি তাঁর বার্তা (রিসালাতাহু) প্রচার করলে না (ফামা বাল্লাগতা রিসালাতাহু)। (৫:৬৭, ৫:৬৭)। দুনিয়ায় প্রেরিত প্রত্যেক নবী-রাসূলদের প্রধান কাজ ছিল এ দ্বীনের প্রচার এবং প্রসার ঘটান। (৭:৬২, ৭:৬৮, ৪৬:২৩, ৩৩:৩৯, ৩:২০)।

শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর ইন্তিকালের পর এ দায়িত্ব এখন উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর পড়েছে। কোরআনের একটি আয়াতে তা স্মরণ করিয়ে দেয়া হল এভাবে- বল, তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তার ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য সেই দায়ী এবং তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী এবং তোমরা তাঁর আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে, আর রাসূলের কাজ তো কেবল স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া। (২৪:৫৪)।দ্বীন প্রচারে কোরআনের প্রত্যক্ষ নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অন্য একটি আয়াতে এ কাজকে সদকায়ে জারিয়া বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে- তুমি কি লক্ষ কর না,

আল্লাহ কীভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? কলেমায়ে তাইয়্যেবা বা সৎ বাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট বৃক্ষ (শাজারুন) যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত। যা প্রত্যেক মৌসুমে ফল দান করে তার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে- এ উপমা মানুষের শিক্ষার জন্য। এমনিভাবে কলেমায়ে খাবিছ বা খারাপ বাক্যের তুলনা এমন এক নিকৃষ্ট বৃক্ষ (শাজারুন) যার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। যার কোনো স্থায়িত্ব নেই। (১৪:২৪-২৬)।কোরআনে এ ধরনের শতশত উৎসাহব্যঞ্জক বাণী রয়েছে যা থেকে মুমিন অনুপ্রাণিত হয়ে ভালো কর্মে দ্বিগুণভাবে উৎসাহী হয়ে ওঠেন।উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট হয়, পৃথিবীর কোনো অঞ্চলের মানুষ যদি ইসলাম কী, তাওহিদ কী? তা না জানতে পারেন তবে এর জন্য কিয়ামতের দিন প্রত্যেকেই দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন। (২৪:৫৪)।

অর্থাৎ ইসলাম একটি প্রচারমুখী জীবনব্যবস্থার নাম, এ দায়িত্ব পালনে সবাইকেই এগিয়ে আসতে হয়। বিশ্বে তাবলিগ জামাত এ গুরু দায়িত্ব পালনে আধুনিক বিশ্বে এ প্রচারে নানা মাত্রা যুক্ত হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর সঙ্গে নানা মত স্পষ্ট হয়ে উঠলেও শুধু তাকওয়ার অনুভূতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী দ্বীন প্রচারে তাবলিগ জামাতের ভূমিকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যায় না।কোনো রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজ খরচে তাবলিগ জামাত বিশ্বব্যাপী দ্বীন প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে। শুধু আল্লাহকে খুশি করার জন্যই পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে দ্বীন প্রচারে এদের নীরব এবং কৌশলী (হেকমত) ভূমিকার কথা এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বহু বিধর্মী তাবলিগ জামাতের তাকওয়াপূর্ণ জীবন ধারণে আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

বর্তমান বিশ্বে মানুষের জীবনব্যবস্থায় যে নৈতিক পরাজয় ঘটছে, ইসলামী অনুশাসন প্রতিপালনের মধ্যেই রয়েছে তার মুক্তি। প্রকৃতপক্ষে মসজিদভিত্তিক জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্যেই রয়েছে মানবতার মুক্তি। তাবলিগ জামাত যেন তারই একটি বাস্তব নমুনা। অহংকার মুক্ত হয়ে বিনয়ী স্বভাব গঠনে তার রয়েছে প্র্যাকটিক্যাল প্রশিক্ষণ।কোরআনে বলা হয়েছে- এবং তারা কাঁদতে কাঁদতে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তা তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে। (১৭:১০৯)। এখানে থাকে না কারও কোনো দোষচর্চা-পরনিন্দা। রয়েছে নফল ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে জীবনকে পরিশুদ্ধ করার নানা কৌশল। কোরআন পাঠের শুদ্ধ উচ্চারণ ও শুদ্ধ সালাত প্রশিক্ষণ ছাড়াও ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের জন্য এটি একটি উত্তম প্রতিষ্ঠান। অসংখ্য সাধারণ মানুষ ছাড়াও ইউনিভার্সিটি পাস করা বহু যুবক এ প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনকে আলোকিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।এখানে সর্বক্ষণ আল্লাহর স্মরণে সময় অতিবাহিত হয়- যা পরবর্তীকালে জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলতে সহায়তা করে। তারা অবগত হয়- ‘ইমান আনার পর যারা কুফুরি করে এবং যাদের সত্য প্রত্যাখ্যান প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে তাদের তওবা কখনও কবুল করা হয় না। এরাই পথভ্রষ্ট। (৩:৯০, ৪:১৩৭)। ফলে তাদের জীবন সংগ্রামমুখর হয়ে পবিত্রতায় ভরে ওঠার লগ্ন আসে।আখিরাতে বিশ্বাসহীন হয়ে গড়ে ওঠা পাশ্চাত্যের জীবনব্যবস্থায় কোনো মুক্তি নেই, নেই কোনো শৃঙ্খলা। সেখানে যৌনজীবন অনিয়ন্ত্রিত-বিস্বাদে ভরা। শতশত পরিবারের ঘর ভাঙছে। নারী-কন্যাশিশুর কোনো নিরাপত্তা নেই। ঘরে-বাইরে কোথাও আজ শান্তি নেই। বর্তমান বিপর্যস্ত মানবতা তাই মসজিদভিত্তিক ইসলামী অনুশাসন পালনের মধ্যেই জীবনের সুখ লুকানো।পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শান্তি এবং নিরাপত্তার স্থান মসজিদ অশান্তির কেন্দ্র বলে প্রমাণ করার নানা অপচেষ্টা চলছে এখন। পূর্ববর্তী নবী-রাসূল এবং বিশ্বনবীর জীবনেও এ ধরনের বহু ষড়যন্ত্র হয়েছিল বলে কোরআনে তার ইঙ্গিত রয়েছে। বলা হয়েছে- আর অবশ্যই মুমিনদের প্রতি শত্রুতায় মানুষের মধ্যে ইহুদি ও মুশরিকদেরই তুমি সর্বাধিক উগ্র দেখবে। তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। (৫:৮২, ৫:৫১)।বিশ্বব্যাপী নানা বেশ-ভূষায় তাদের নানামাত্রা যুক্ত হচ্ছে। তাই দ্বীন প্রচারে মুমিনদের আরও সতর্ক হওয়া এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Leave a Comment