নামাজ পড়ে এসে টিভি দেখা আর হলো না জুবায়েদের

জাতীয়

জুবায়েদ (৭) মায়ের কাছে বায়না ধরেছিল টিভিতে ‘মটু-পাতলু’ সিরিজ দেখবে। মা তখন বলছিলেন, ‘নামাজটা পড়ে এসে টিভি দেখতে বসো।’ মায়ের কথামতো জুবায়েদ এশার নামাজ আদায় করতে মসজিদে যায়। ছেলে এসে টিভি দেখবে এ কারণে মা টিভিটা খোলাই রাখেন। কিন্তু জুবায়েদের আর ফেরা হয়নি, দেখা হয়নি প্রিয় সিরিজও।

আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে জুবায়েদের মা রাহিমা বেগম এ কথা বলতে বলতেই বিলাপ করছিলেন।গতকাল শুক্রবার এশার নামাজের সময় নারায়ণগঞ্জ শহরের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা এলাকায় বায়তুস সালাত মসজিদে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আজ শনিবার বিকেল পর্যন্ত ১৭ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে জুবায়েদও আছে। জুবায়েদের বাবা জুলহাস ফরাজি নারায়ণগঞ্জের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। পরিবার নিয়ে তিনি ফতুল্লার তল্লা এলাকায় থাকতেন। মসজিদে বিস্ফোরণের পর আহত অবস্থায় জুবায়েদকে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখান থেকে তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।

রাহিমা বেগম বিস্ফোরণের খবর পেয়ে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে ছুটে যান। পরে সেখান থেকে জানানো হয়, জুবায়েদকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। রাহিমা বেগম সকালে ঢাকায় আসেন। সকাল ১০টায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, জুবায়েদ আর বেঁচে নেই।রাহিমা বেগম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘ছেলে নামাজে, তাই টিভি বন্ধ করিনি। ২০ মিনিট পরই জানতে পারি আমার বুকের মানিক আর টিভি দেখতে আসবে না। আমার সন্তান কখনোই আর ফিরবে না বাসায়।’‘আমার বুকের ধন আমাকে ছেড়ে কোথায় চলে গেল? ও আমার সোনা রে, আমার সোনা মানিক, আমারে রেখে তুই কই গেলি। আমার সব তছনছ হয়ে গেল’ বলে বিলাপ করছিলেন জুবায়েদের মা। এ সময় রাহিমা বেগমের পাশে ছিলেন নিহত জুবায়েদের এক মামাত বোন (২২)। তিনি এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণের পর দগ্ধ অবস্থায় জুবায়েদ উপুড় হয়ে বসেছিল, সবশেষে তাকে উদ্ধার করা হয়।’

জুবায়েদের মৃত্যুর কথা শুনে হাসপাতালে ছুটে আসেন বাড়ির মালিক দিলারা আক্তার মুন্নী। তিনি বলেন, ‘জুবায়েদের প্রিয় সিরিজ ছিল মটু-পাতলু। মায়ের কথামতোই সে মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছেল। কিন্তু তাকে লাশ হয়ে ফিরতে হলো।’এদিকে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় আজ শনিবার বিকেলে পর্যন্ত ১৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন, মসজিদের নিচে গ্যাসের লাইনে অসংখ্য লিকেজ থেকে গ্যাস বের হয়ে এই বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে ফতুল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম হোসেন জানান, বিস্ফোরণের সময় শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করছিলেন।আহতদের প্রথমে শহরের ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে গুরুতর আহতদের ঢাকায় পাঠানো হয়। এর মধ্যে ৩৭ জনকে শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারিতে নেওয়া হয়।গতকাল শুক্রবার এশার নামাজের সময় নারায়ণগঞ্জ শহরের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা এলাকায় বায়তুস সালাত মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত শিশু জুবায়েদের বেশ কিছুদিন আগের ছবি। সংগৃহীত ছবি

আহতদের কেউই শঙ্কামুক্ত নন বলে জানিয়েছেন বার্ন ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন সর্বাত্মক চেষ্টা করার জন্য।’ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘আমাদের যা যা সুযোগ-সুবিধা আছে, সব ব্যবহার করে আমরা চেষ্টা করছি; বাকিটা ওপরওয়ালার ইচ্ছে। সবাইকে বলব, আহতদের জন্য দোয়া করবেন।’এদিকে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে দাফন সম্পন্ন করার জন্য ২০ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার করে টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *