পিতা-পুত্রের ভ’য়ংকর প্র’তারণা, টা’র্গেট কা’রাব’ন্দিদের স্ত্রী-কন্যা

জাতীয়

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছের লোক অথবা নগরীর মেয়রের বন্ধু পরিচয় দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বাবা গোলাম মোহাম্মদ কালু ও ছেলে গোলাম মোস্তফা আদর (৩০)। কা’রাব’ন্দিদের স্ত্রী, কন্যা ও স্বজনদের টার্গেট করে প্র’তারণার জাল ফে’লে তারা। জা’মিন পাইয়ে দেয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া ছাড়াও ব্ল্যা’কমেইল করে তাদের সঙ্গে অ’নৈতিক সম্পর্ক তৈরিরও চেষ্টা চা’লায় এই চ’ক্র। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর গো’য়েন্দা পুলিশ গোলাম মোহাম্মদ কালু ও তার ছেলে গোলাম মোস্তফা আদর ওরফে আলোকে গ্রে’প্তার করে। তাদের জি’জ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে প্রায় একযুগ ধরে নানামুখী প্র’তারণা করার ঘটনা।সর্বশেষ দু’জন সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের পরিবারকে ফাঁ’দে ফে’লে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। এর মধ্যে ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ময়নুল হক মনজুকে জা’মিন পাইয়ে দেয়ার কথা বলে তার স্ত্রী জাহা’নারা বেগম রেখার কাছ থেকে সাড়ে ১১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় তারা। স্বামীকে জা’মিন পাইয়ে দেয়ার কথা বলে আরেকজন কা’রাব’ন্দি ওয়ার্ড কাউন্সিলরের স্ত্রীর কাছ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টাকা হাতিয়েছে তারা। ওই কাউন্সিলরের স্ত্রীকে ব্ল্যা’কমেইল করতেও নতুন ফাঁদ পাতে তারা।

জাহা’নারা বেগম রেখা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তার স্বামী কা’রাব’ন্দি থাকায় তারা হতাশ হয়ে পড়েন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের দিকে গোলাম মোস্তফা তার নম্বরে ফোন করে। এরপর সে জানায়, অনেক মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে তার পরিচয়। মনজুকে জা’মিন করাতে অন্যদের তিন মাস লাগলে তার লাগবে তিন দিন। তবে জা’মিন করানোর বিনিময়ে ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। এরপর কয়েক দফায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা দেওয়ার পরও জা’মিনের ব্যবস্থা হয়নি। এক পর্যায়ে তারা বুঝতে পারেন প্র’তারকদের ফাঁ’দে পড়েছেন।জাহা’নারা বেগম আরো বলেন, একটি মার্কে’টে তার নামে থাকা দোকান বিক্রি করে টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করছিলেন তিনি। পরে ওই মার্কে’টের দলিল গোলাম মোস্তফা ও তার বাবা গোলাম মোহাম্মদ কালুকে দেখানো হয়। তাদের কাছে দোকান কেনার একাধিক পার্টি রয়েছে বলেও জানায় তারা। পরে কৌশলে তার কাছ থেকে দোকানের দলিল হাতিয়ে নেয়া হয়।

জানা গেছে, এক যুগের বেশি সময় ধরে গোলাম মোহাম্মদ কালুর বৈধ আয়ের সোর্স নেই। তবে ধানমন্ডিতে পরিবার নিয়ে আলিসান ফ্ল্যাটে থাকে। চলাফেরা করে টয়োটার প্রিমিও মডেলের গাড়িতে। তাদের অ’বৈধ অর্থের উৎস এক জমি একাধিকবার বিক্রি, সমাজের প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে ব্যাংক থেকে ঋ’ণ পাইয়ে দেয়ার ফাঁদ। গ্যাসের সংযোগ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চ’ক্র। আবার কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ভালো জায়গায় পোস্টিং পাইয়ে দেয়ার কথা বলেও লাখ লাখ টাকা পকে’টে ভরেছে আদর ও তার বাবা।বিলাসী জীবনযাপনকারী গোলাম মোহাম্মদ কালুর গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। সব সময় দামি পোশাক পরে কালু ও আদর চলাফেরা করত। ২০০৮ সালে অনেক মানুষকে প্র’তারিত করার পর আত্মগো’পনে যায় কালু। বাবার কাছে পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য ব্যাংক থেকে ঋ’ণ নেয় ছেলে। কিন্তু পরিশোধ করেনি এক টাকাও। ব্যাংকের ঋ’ণ পরিশোধ করতে না পারায় ২০১২ সালে নিজেদের বাড়ি নিলামে ওঠে। এরপর বাড়িছাড়া হয়ে দেনাদারদের টাকা পরিশোধ না করে পা’লিয়ে আসে ঢাকায়। বসবাস করতে থাকে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে। এরপর বাবা-ছেলে প্র’তারণার পেশাই বেছে নেয়। প্রথম দিকে নিজেদের আত্মীয়দের সঙ্গে প্র’তারণা করত। নিলামের বাড়ি ও জায়গা কিনে দেয়ার কথা বলে এক আত্মীয়র কাছ থেকে কালু ২৫ লাখ টাকা হাতায়।

উত্তরাতে বসবাস করাকালীন ২০১৫ সালে প্র’তারক আদরের সঙ্গে আসিফ ইমরান নামে বেস’রকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ূয়া এক ছাত্রের পরিচয় হয়। আসিফের প্রকৌশলী বাবা আর শিক্ষিকা মা হজে চলে গেলে আসিফকে কৌশলে নারায়ণগঞ্জের লোকশিল্প জাদুঘর দেখানোর নাম করে আদর তার বাবা কালু এবং সহযোগীরা নিয়ে যায় নারায়ণগঞ্জে। আসিফকে বেদম প্রহারের পর টাকা না পেয়ে তাকে গ’লা টি’পে হ’ত্যা করে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফে’লে দেয় তারা। অ’জ্ঞাত হিসেবে ওই লা’শকে উ’দ্ধার করে কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ। পরে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহযোগিতায় তাকে পোস্তা কবরস্থানে দাফন করা হয়। ২০১৭ সালের দিকে ডি’বি পুলিশের হাতে গ্রে’প্তার এক আ’সামির মাধ্যমে পুলিশ এবং আসিফের বাবা নিশ্চিত হন কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশের উ’দ্ধার করা ওই লা’শ আসিফের। দেড় বছর পর কবর থেকে হাড় উ’দ্ধার করে বাবা-

মায়ের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আসিফের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয় পুলিশ। দীর্ঘ ত’দন্তের পর সিআইডি পুলিশ অ’পহরণ করে হ’ত্যাকাণ্ডের এ মা’মলার প্রধান আ’সামি হিসেবে গোলাম মোস্তফা আদর এবং তার বাবা গোলাম মোহাম্মদ কালুকে অ’ভিযুক্ত করে ২০১৯ সালে চার্জশিট দাখিল করে।জানা যায়, আদর এখন পর্যন্ত চারটি বিয়ে করেছে। চারটি বিয়েই করেছে প্র’তারণার ফাঁদ পেতে। এরইমধ্যে তিন স্ত্রী তাকে তালাক দিয়েছেন। দ্বিতীয় স্ত্রী আলিশা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে বড় ব্যবসায়ী সেজে আলিশাকে বিয়ে করে আদর। প্রেমের টানে আলিশা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে এসে ২০১৮ সালে বিয়ে করেন আদরকে। কিছু দিন পর আদরের প্র’তারণার বি’ষয় জানতে পেরে তাকে তালাক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত যান আলিশা।

রাজশাহী রেঞ্জে কর্মরত এসপি বেলায়েত হোসেনও তাদের প্র’তারণার শি’কার হয়েছেন। উলটো বেলায়েত হোসেনের বি’রুদ্ধেই তারা মা’মলা করেছে। তাকে ঢাকায় বদলি করে দেওয়ার কথা বলে আদর এসপিকে ফোন করে বলেন, আপনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ফোন করছেন, সবচেয়ে শক্ত তদবির হচ্ছে। আপনার এই বদলি এবার কোনোভাবেই ঠেকবে না। কিছুদিন পর নিজের অ’সুস্থতার কথা জানিয়ে ঐ পুলিশ সুপারের কাছে ১০ লাখ টাকা ধার চান আদর। অ’সুস্থতার প্রমাণ দিতে একটি ছবিও পাঠান। বেলায়েত হোসেন তাকে ৫ লাখ টাকা ধার দেন। টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় টালবাহা’না। উলটো পুলিশ সুপারের বি’রুদ্ধে করেন মা’মলা, রটাতে থাকেন নানা ধরনের কুৎসা।পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন বলেন, গত কোরবানির ঈদের সময় ধারের ৫ লাখ টাকা শোধ করার কথা ছিল। কিন্তু দেয়নি। পরে এই টাকা চাইলে আমাকে হু’মকি দিয়ে উলটো আমার বি’রুদ্ধে মা’মলা করে দিয়েছে। অর্থমন্ত্রীর মেয়েকে দিয়ে তদবির করিয়ে ১০ কোটি টাকা ঋ’ণের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন এক ব্যবসায়ীকে। গোলাম জিলানী চৌধুরী টিপু নামে ঐ ব্যবসায়ী বলেন, একটি বেস’রকারি ব্যাংক থেকে তাদের ১০ কোটি টাকা লোন করিয়ে দেয়ার কথা বলে তিনি ও তার এক বন্ধুর কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। তাদের সঙ্গে ধানমন্ডির একটি রেস্টুরেন্টে দেখা করে টাকাগুলো নেন আদর ও তারা বাবা। একইভাবে মৃণাল বাবু নামে এক কার ব্যবসায়ীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেন ৬ লাখ টাকা।

ঢাকা মহানগর গো’য়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, ২০ দিনের রি’মান্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছে প্র’তারক পিতা-পুত্র। তারা বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে প্র’তারণা করে টাকা নিয়েছেন। বড় ধরনের মা’মলা থেকে জা’মিন ও ব্যাংক লোন করিয়ে দেয়ার নামে অসংখ্য ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের গ্রে’প্তারের খবর পাওয়ার পর প্রতিদিনই প্র’তারিত হওয়া ব্যক্তিরা ডি’বি কার্যালয়ে ভিড় জমাচ্ছেন। অনেকে মা’মলারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন।তিনি জানান, আদরের প্রথম প্র’তারণার শি’কার হয় আপন ফুফাতো ভাই ও ফুফাতো বোন। নিলামের বাড়ি ও জায়গা কিনে দেয়া, ডলার এবং লটারির ব্যবসার নাম করে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় প্রায় ২৫ লাখ টাকা। ২০১২ সালের সেই টাকা এখনো ফেরত দেয়নি স্বজনদের।এসপি বেলায়েত হোসেনের বি’ষয়ে মশিউর রহমান বলেন, প্র’তারিত হওয়ার বি’ষয়টি জানতে পেরে এসপি বেলায়েত ধানমন্ডি থানায় একটি জি’ডি করেন। এরইমধ্যে মতিঝিলের এজিবি কলোনি থেকে অ’স্ত্র ও মা’দকসহ পিতা-পুত্রকে গ্রে’প্তার করা হয়। দুই মা’মলায় তারা ২০ দিনের রি’মান্ডে রয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *