২৯ লাখ টাকার কারখানা থেকে মাসে ৭ লাখ টাকাও আয় করেছি

জাতীয়

এনভয় গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী কুতুবউদ্দীন আহমেদ ১৯৫৬ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক কুতুবউদ্দীন আহমেদ জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। তবে উদ্যোক্তা হওয়ার অদম্য ইচ্ছার কারণে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি ১৯৮৪ সালে এনভয় লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতে ব্যবসা শুরু করেন।একজন তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক হিসেবে যাত্রা শুরু করে পরবর্তী সময়ে তিনি বস্ত্র, রিয়েল এস্টেট, এয়ারলাইনস, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, ট্রেডিং, তথ্যপ্রযুক্তি, কম্পিউটার সিস্টেমস অপারেশন্স ও হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। নিজ যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতাগুণে এনভয় গ্রুপ আজ দেশের অন্যতম বড় কনগ্লোমারেটে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায় অবদানের জন্য এনভয় গ্রুপ বেশ কয়েকবার জাতীয় পর্যায়ে সেরা রফতানিকারকের পুরস্কার পেয়েছে।

কুতুবউদ্দীন আহমেদ মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাছাড়া তিনি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। ব্যবসার বাইরে তিনি খেলাধুলা, দাতব্যসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রয়েছেন। সম্প্রতি তিনি তার নিজের প্রতিষ্ঠান এনভয় গ্রুপসহ গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতের বিভিন্ন দিক নিয়েকথা বলেছেন।আমি ১৯৭৯ সালে বুয়েট থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক করে জনতা ব্যাংকে চাকরি করা শুরু করি। সেখানে পাঁচ বছর চাকরি করেছি। ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় আসার মূল কারণটা ছিল আর্থিক। আমি ১৯৮৩ সালে বিয়ে করি। তখন আমার কিছু ঋণ হয়ে যায়। সংসারের খরচ সামাল দিতে গিয়ে আমার নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। সত্ভাবে জীবনযাপন করতে গিয়ে দেখলাম সংসার চলছে না।

অন্যদিকে নিজের পারিবারিক শিক্ষার কারণে আমার পক্ষে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমেও টাকা কামানো সম্ভব না। ব্যাংকে আমি তখন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ঋণ বিতরণের বিষয়গুলো দেখতাম। একদিন বুয়েটেরই একজন বড় ভাই আমাকে বললেন, তুমি এত মানুষকে ইন্ডাস্ট্রির জন্য টাকা দিচ্ছ নিজে করছ না কেন? আমি তখন তাকে বললাম, ইন্ডাস্ট্রি করতে হলে তো টাকা লাগে, আমি টাকা পাব কোথায়? তখন তিনি জানতে চাইলেন কত টাকা প্রয়োজন।আমি এমনি তাকে বললাম যে আমি যদি ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে পারি, তাহলে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ ক্রেডিট থেকে আরো ২০ লাখ টাকা পাব। আর ৩০ লাখ টাকা দিয়ে একটা ছোট আকারের গার্মেন্টস করা যাবে। তখন তিনি বললেন, তাহলে করছ না কেন? আমি বললাম যে ১০ লাখ টাকা আমি কোথায় পাব? তখন তিনি বললেন যে ৫ লাখ টাকা আমি দেব আর বাকি ৫ লাখ টাকা তুমি অন্য কারো কাছ থেকে জোগাড় করো।

এ কথা শুনে আমি মোহামেডান ক্লাবে জাতীয় দলের ফুটবলার বাদল রায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। মোহামেডান ক্লাবে আমার প্রায়ই যাতায়াত ছিল। সেখানে ফুটবলার বাদল রায়, আজমতদের সঙ্গে দেখা হলেই তারা আমাকে বলত যে আমাদের কাছে তো কিছু টাকা আছে দেখেন না কোনো কাজে লাগানো যায় কিনা? বাদল রায় আগে বলেছিল বলে তাকেই আগে খুঁজতে গেলাম।এ সময় জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার সালাম মুর্শেদীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সে জানতে চাইল কুতুব ভাই কোথায় যান? আমি বললাম বাদল রায়কে খুঁজছি। তখন সালাম বলল, কী দরকার আমাকে কি বলা যায়? তো আমি বিষয়টি তার সঙ্গে শেয়ার করলাম। শুনে সে বলল, কুতুব ভাই আমাকে নেয়া যায় না। আমি বললাম ঠিক আছে।

সালামকে নিয়ে তখন সেই বড় ভাইয়ের কাছে গেলাম। তাকে বললাম যে সালাম টাকা দিতে রাজি আছে। তখন সেই বড় ভাই সালামকে বললেন, আমি কুতুবকে বিশ্বাস করে টাকা দিচ্ছি, তুমিও কি তাকে বিশ্বাস করো। সালাম বলল, হ্যাঁ আমিও বিশ্বাস করি। তখন সেই বড় ভাই আর সালাম টাকা দিলেন আর আমি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে টাকা রাখলাম।তারপর আমরা ১৯৮৪ সালের ২৭ মার্চ কোম্পানি গঠন করলাম। কোম্পানি গঠন করার পরই আমি চাকরি ছেড়ে দিই। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে টাকা নেয়ার জন্য বেশকিছু আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আর এগুলো শেষ হতে বেশ কয়েক মাস সময় লাগে। তো এই সময়টা বসে না থেকে আমরা ব্যাংক থেকে ডেফার্ড এলসি খুলে মেশিন এনে ব্যবসা শুরু করতে চাইছিলাম। কিন্তু ব্যাংক কোনো জামানত ছাড়া আমাদের টাকা দিতে চাইছিল না।

অন্যদিকে আমার কিংবা সালামের কাছে জামানত দেয়ার মতো তেমন কোনো সম্পদ ছিল না। মগবাজারে আমাদের একটা পৈতৃক বাড়ি ছিল। মা-বাবার অনুমতি নিয়ে সেটি মর্টগেজ রেখে ব্যাংকে এলসি খুললাম। তারপর মালিবাগে বাড়ি ভাড়া নিয়ে কারখানা স্থাপন করি। কিন্তু আমার ব্যবসার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় কীভাবে ব্যবসা শুরু করব, কোথায় ক্রেতা খুঁজে পাব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমার কয়েকজন বন্ধু ছিল, যারা গার্মেন্টসে চাকরি করত। তাদের কাছে পরামর্শ চাইলাম কীভাবে কী করা যায়।তারা বলল, প্রথমে সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে কাজ শুরু করার জন্য। আর সোনারগাঁও হোটেলে ক্রেতাদের আসা-যাওয়া আছে, সেদিকে যাতে লক্ষ রাখি। প্রথমে এক-দুই মাস সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করেছি। একদিন অফিসে বসে আছি, এমন সময় একজন আকবর লাকখানি নামে ভারতীয় ক্রেতা আমার অফিসে এলেন। তিনি আমার কারখানা ঘুরে দেখলেন।

আমি তাকে জানালাম যে আমার কারখানা অন্যদের তুলনায় বেশি দক্ষ। অন্যরা যেখানে ৯৬ থেকে ১০০টি মেশিনের মাধ্যমে ৭০০-৮০০ পিস তৈরি করতে পারত, সেখানে আমি ৪৪টি মেশিন দিয়েই ৭০০-৮০০ পিস বানাতে পারতাম। এর কারণ হলো আমি বেশি বেতন দিয়ে দক্ষ শ্রমিক নিয়েছিলাম, যাতে তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চটা পাওয়া যায়।তিনি আমার কারখানা দেখে সন্তুষ্ট হয়ে সুইডেনের একটি কোম্পানির জন্য পাঁচ হাজার পিসের অর্ডার দিলেন। অন্যদের চেয়ে তিনি আমাকে ৫০ সেন্ট বেশিই দিলেন। আমি অর্ডার অনুসারে পণ্য তৈরি করে পাঠিয়ে দিলাম। আর ব্যাংকে বিল জমা দিলাম। একদিন ব্যাংকে যাওয়ার পর শুনি, আমার একটি ক্রেডিট ভাউচার আছে। আমি জানতে চাইলাম কিসের ভাউচার। তারা বলল, আমার অর্ডার ব্যাংক কিনে নিয়েছে।

আমি বললাম, আমি তো মাত্র বিল জমা দিলাম, পেমেন্ট তো এখনো আসেনি। তখন ব্যাংক বলল, সমস্যা নেই ডকুমেন্ট ঠিক থাকলে আমরা অর্ডার কিনে নিই। আমি মনে মনে বেশ খুশিই হলাম যে আরে কাগজ দিলেই তো টাকা পাওয়া যায়। টাকা পেয়েই আমি শেরাটন হোটেলে গেলাম আকবর লাকখানিকে তার পাওনা বুঝিয়ে দেয়ার জন্য। টাকা পেয়ে তো তিনি বেশ অবাক হলেন, এত তাড়াতাড়ি কীভাবে টাকা দিলাম, এখনো তো বিল পেমেন্ট হয়নি।আমি তখন তাকে জানালাম, ব্যাংক আমার অর্ডারটা কিনে নিয়ে আমাকে আগেই টাকা দিয়ে দিয়েছে। আর তাই আমি টাকা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার কাছে চলে এসেছি। এতে তিনি এতটাই অবাক হলেন যে তার স্ত্রীকে ডেকে বললেন, দেখো এই ছেলেটি টাকা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে দিতে চলে এসেছে, যেখানে অন্যদের কাছ থেকে পাওনা টাকা বুঝে নিতে তাদের পেছনে পেছনে ঘুরতে হয়। তিনি আমাকে বললেন, টাকাটা তোমার কাছে রেখে দাও আমার যখন প্রয়োজন হবে তোমার কাছ থেকে চেয়ে নেব।

তুমি আমার ছেলের মতো, আমি তোমাকে কাজ দেব তুমি চিন্তা করো না। এর এক-দুদিন পরই তিনি আমার কারখানায় এলেন। তিনি আমাকে চার মাসের কাজ দিয়ে জানতে চাইলেন তুমি কত পিস তৈরি করতে পারবে? আমি জানালাম, সর্বোচ্চ ৩০ হাজার পিস তৈরি করতে পারব। তিনি তখন আমাকে বললেন, আমি তোমাকে আরো বেশি দিচ্ছি, বাকিটা তুমি সাব-কন্ট্রাক্টে করে নিও। সমস্যা হলে আমি দেখব। এরপর প্রতি মাসেই আমার হাতে অনেক কাজ এবং আমি ভালো টাকা আয় করছি।

এভাবে ১৫ মাসের মধ্যে আমি ব্যাংকের সব ঋণ পরিশোধ করে দিলাম। এর আট-নয় মাসের মধ্যেই আমার ব্যাংক আকাউন্টে ১ কোটি টাকা জমা হয়ে গেল। আমি ব্যাংকের কাছে মর্টগেজ রাখা বাড়ির দলিলপত্র আম্মার কাছে ফেরত দিলাম। এরপর থেকে আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ব্যবসা শুরুর তিন-চার বছরের মধ্যেই আট-নয়টি গার্মেন্টস কারখানা কিনে ফেললাম। অন্যান্য খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছি। আমার বন্ধু ড. তৌফিক এম সেরাজ সে সময় বুয়েটের শিক্ষক ছিল।

সে প্রায়ই আমার অফিসে এসে আড্ডা দিত। একদিন কথা প্রসঙ্গে সে বলল, শিক্ষকতা করতে ভালো লাগছে না। চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করবে। শিক্ষকতা পেশার প্রতি আমার দুর্বলতা ছিল, আমি তাকে অনুরোধ করলাম যাতে চাকরি না ছাড়ে। কিন্তু সে অনড়, ব্যবসা করবে। আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, কী ব্যবসা করবে।

সে জানাল, রিয়েল এস্টেট নিয়ে কিছু করতে চায়। এর মধ্যে একদিন আমার অফিসে স্কয়ারের তপন ভাই এল, সিরাজও ছিল। তপন ভাইকে আমি জানালাম সিরাজ রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করতে চায়, আপনি থাকবেন নাকি? তপন ভাই রাজি হলেন। তখন আমি সিরাজ আর তপন ভাই মিলে শেলটেক খুললাম।এই শেলটেক থেকে আরো বেশকিছু প্রতিষ্ঠান যেমন কনসালট্যান্সি ফার্ম, সিরামিক টাইলস ফ্যাক্টরি, ব্রোকারেজ হাউজ, এয়ারলাইনস, ইলেকট্রিক পুল ম্যানুফ্যাকচারিংসহ আরো বেশকিছু প্রতিষ্ঠান করলাম। আর এনভয় গ্রুপের ব্যবসাও তখন চারদিকে ডালপালা ছড়িয়েছে। আমরা বাংলাদেশে আইবিএমের সোল ডিস্ট্রিবিউটর ছিলাম। তাছাড়া ব্যাংকিং খাতে ইকুইপমেন্ট সরবরাহ আমরাই প্রথমে শুরু করি। তারপর টেক্সটাইল কারখানা করেছি। গার্মেন্টসের ব্যবসা তো বাড়ছেই।

আমরা যখন শুরু করি, তখন নারীদের ক্যাম শার্ট বানাতে সাড়ে ৮ ডলারের মতো খরচ পড়ত। আর এখন কেউই এ দামে এ শার্ট বানাতে পারবে না। খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে আজ থেকে ৩৫ বছর আগে আমরা গার্মেন্টস থেকে ব্যবসা করে যে পরিমাণ টাকা আয় করেছি, এখন আর এটি সম্ভব নয়। এমনও সময় গেছে, আমার ২৯ লাখ টাকার কারখানা দিয়ে আমি মাসে ৭ লাখ টাকাও আয় করেছি।এখন গার্মেন্টস কিংবা টেক্সটাইল খাতের ব্যবসায় আগের মতো আয় করা সম্ভব নয়। এর কারণ আগে প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা কম ছিল। চীন তখনো সেভাবে শুরু করেনি। ফলে আমাদের সুযোগটা বেশি ছিল। আগে গার্মেন্টস খাতের ব্যবসা সেভাবে স্ট্রাকচারড ছিল না। এখনো অনেকটাই স্ট্রাকচারড অবস্থায় চলে এসেছে। বিশেষ করে তাজরীন গার্মেন্টস ও রানা প্লাজার মতো ঘটনার কারণে এ খাতে কমপ্লায়েন্সের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। এর পাশাপাশি ব্যয়ও বেড়েছে অনেক।

আমি মনে করি, বর্তমানে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতের জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কমপ্লায়েন্স মেনে চলা। ক্রেতারা এখন কমপ্লায়েন্সের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন। তাই সবসময় এটি বজায় রাখতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। গার্মেন্টস খাতে রফতানির বাজার এখন অনেক বেশি প্রতিযোগিতা হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যমান বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি আপনাকে নতুন বাজার খুঁজতে হবে। এজন্য ব্যয় কমানোর কোনো বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ খাতের অনেক উন্নতি হয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু আমরা মানসম্মত বিদ্যুৎ পাইনি।এজন্য আমাদের জেনারেটর ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাটারি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে আমাদের ডিজেল কিনতে অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। আবার কোটি টাকা খরচ করে ব্যাটারি কিনতে হচ্ছে। এ টাকাটা আমরা যন্ত্রপাতির পেছনে খরচ করতে পারলে উৎপাদন আরো বাড়ত। এতে কর্মসংস্থানও বাড়ত। তাই এখন আমাদের মানসম্মত বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বন্দরের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রফতানিতে বেশি সময় লাগলে আমাদের ব্যয় বেড়ে যায়। আর এই বাড়তি ব্যয় উদ্যোক্তাকেই বহন করতে হয়। ফলে বন্দরের দক্ষতা বাড়লে ব্যয় কমে আসবে। আমাদের রেলওয়ের কার্গো পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে হবে। রেলে পণ্য পরিবহন করলে ব্যয় অনেক কম হয়। এতে দুদিকেই লাভ। পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের যেমন ব্যয় সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বাড়লে রেলওয়েরও আয় বাড়বে।আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, ক্রেতাদের মূল্য বাড়ানোর কথা বলে লাভ নেই। তারা যেখানে কম পাবে, সেখান থেকেই পণ্য নেবে। এটা চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আমরা যেটা পারি, নিজেদের দক্ষতা বাড়িয়ে ব্যয় কমিয়ে আনতে পারি। এতে আমাদের মুনাফা মার্জিন বাড়বে। আমরা বর্তমানে মাঝারি মূল্যের পণ্য তৈরি করছি। এখন উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে নজর দিতে হবে। এতে মুনাফার পরিমাণ বাড়বে। তাছাড়া আন্ডারগার্মেন্টসের একটি বিশাল বাজার রয়েছে। আমাদের এ বাজারে নিজেদের শেয়ার বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।

আমাদের এখানে দক্ষ কর্মীর সংকট রয়েছে। তাই আমরা বাধ্য হয়েই বিদেশ থেকে কর্মী আনছি। আমাদের দেশে সবারই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার দিকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা যখন চাকরির ইন্টারভিউ নিই, প্রার্থীদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দেখে হতাশ হতে হয়। অনেকেই ইংরেজিটাই ঠিকমতো জানে না। তাহলে এই মাস্টার্স আর এমবিএ ডিগ্রির কি কোনো মূল্য আছে?পুঁজিবাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। এখানে তিন মাস পরপর আর্থিক প্রতিবেদন দিতে হয়। মুনাফার দিকে লক্ষ রাখতে হয়। শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে হয়। একটি কাঠামোগত পদ্ধতিতে পেশাদার কর্মী দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো গেলে সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর এসব দিক চিন্তা করলে আমি মনে করি ক্যাপিটাল মার্কেট ইজ বেটার।

এখানে সময়টা হচ্ছে মূল বিষয়। আমাদের দ্রুত তহবিলের প্রয়োজন হলে তখন ব্যাংকের কাছে যেতেই হয়। আমরা সবসময় পাবলিকের কাছ থেকেই তহবিল নিতে আগ্রহী। কারণ এতে ঝুঁকি কম এবং ব্যয়ও কম হয়। অন্যদিকে ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে মর্টগেজ দিতে হয়, এতে ঝুকিও বেশি থাকে। আমরা যেমন প্রেফারেন্স শেয়ার ছেড়ে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছি। আবার দ্রুত তহবিল লাগলে ব্যাংক থেকেও নিচ্ছি।অবশ্যই নগদ লভ্যাংশ দেয়াকে আমি সমর্থন করি। কারণ এটাই কোম্পানির সক্ষমতার পরিচায়ক। মানুষ অনেক প্রত্যাশা করেই কোম্পানির শেয়ার কেনে। তাই তাদের ভালো লভ্যাংশ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ন্যূনতম ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়াই উচিত। যারা বুদ্ধিমান তারা শেয়ারহোল্ডারদের বেশি লভ্যাংশ দেয়। তবে ব্যবসা সম্প্রসারণের ইস্যু থাকলে সেটা ভিন্ন কথা।

তখন আপনি কোম্পানির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে লভ্যাংশ কম দিতেই পারেন। শেয়ারহোল্ডারাও তখন এটিকে সমর্থন করবেন। আমরা যখন ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছি, তখন লভ্যাংশ কম দিয়েছি। তবে সম্প্রসারণ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের মুনাফা বেড়েছে এবং আমরা লভ্যাংশও বেশি দিয়েছি। এ বছরও আমাদের ভালো মুনাফা হবে এবং শেয়ারহোল্ডারদেরও আমরা বেশি লভ্যাংশ দিতে পারব ইনশাআল্লাহ।আমরা এখন ইকো ফ্রেন্ডলি ফ্যাব্রিকসের মানোন্নয়নে কাজ করছি। বর্তমানে এর বাজার খুব একটা না থাকলেও ভবিষ্যতে এটির বিশাল বাজার তৈরি হবে। আর সেটি চিন্তা করেই আমরা এগোচ্ছি। এজন্য আমরা একটি ল্যাব নির্মাণ করছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে আমরা এমন পণ্য তৈরি করব, যাতে আমাদের ক্রেতাদের কাছে যেতে না হয়, বরং তারাই আমাদের কাছে আসবে। ভোলায় আমরা একটি সিরামিক টাইলস কারখানা করেছি। এরই মধ্যে কারখানাটিতে উৎপাদন শুরু হয়েছে।

আগামী দেড় বছরের মধ্যে আমাদের দ্বিতীয় ইউনিট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর তৃতীয় ইউনিটও করব। ভবিষ্যতে এটিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করারও চিন্তাভাবনা রয়েছে। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসা করতে হবে। ব্যবসা করতে মূলধন লাগে না। আমিই এর উদাহরণ। সুযোগ আসবেই। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তা কাজে লাগাতে হবে। স্বপ্ন দেখতে কেউ কার্পণ্য করবেন না। সব স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বপ্ন দেখা বাদ দেয়া যাবে না।কোথায় বিনিয়োগ করবেন, সেটা বিনিয়োগকারীদের বুঝতে হবে। না বুঝলে কাউন্সেলিং করতে হবে। কোন কোম্পানির ভবিষ্যৎ ভালো, সেটা জানতে হবে। কেউ স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগ করে। আর কেউ দীর্ঘমেয়াদে। যারা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করবেন তাদের কোম্পানি ম্যানেজমেন্ট কেমন, ভবিষ্যতে কারা কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় আসবে, বিক্রি ও মুনাফা কেমন হচ্ছে, নিয়মিত কর দিচ্ছে কিনা—সেটি দেখতে হবে। কারো কথায় হুজুগে বিনিয়োগ করা যাবে না। এটা বিনিয়োগের ধরনের মধ্যে পড়ে না। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *